জলবায়ু সংকট ঠেকাতে ভোগ কমানো ও গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণের আহ্বান
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভোগ কমানো, দূষণকারী শিল্পকে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে রূপান্তর এবং বায়ুমণ্ডল থেকে ইতোমধ্যে জমে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়া গেলে এক প্রজন্মের মধ্যেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে অনেকটাই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব বলে মনে করেন জলবায়ুবিজ্ঞানী রব জ্যাকসন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গ্লোবাল কার্বন প্রজেক্টের চেয়ারম্যান রব জ্যাকসন সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রবন্ধে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তুলে ধরে এ ধরনের পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
আমাজনের মামেরাউয়া সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট রিজার্ভে গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জ্যাকসন জানান, সেখানে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও মিথেন নির্গমন পর্যবেক্ষণের জন্য নতুন টাওয়ার স্থাপন করা হচ্ছে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেন স্বল্পমেয়াদে অনেক বেশি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। তাঁর মতে, গত পাঁচ বছরে বায়ুমণ্ডলে মিথেনের ঘনত্ব রেকর্ড রাখার ইতিহাসে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে।
বিশেষ করে উষ্ণমণ্ডলীয় জলাভূমি ও মৌসুমি প্লাবিত বন মিথেনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে এসব অঞ্চলে জীবাণুর কার্যক্রম বেড়ে মিথেন নিঃসরণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জ্যাকসনের মতে, আমাজন এখন বন উজাড়, অবৈধ সোনার খনন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত চাপে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ২০২৩ সালে আমাজনের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র খরা, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ও দাবানল পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ব্রাজিলের লেক তেফেতে পানির তাপমাত্রা ৪০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে যাওয়ার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক নদী ডলফিনের মৃত্যুর ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় জ্যাকসন তিন ধরনের সমাধানের কথা বলেছেন। প্রথমত, উচ্চ-আয়ের দেশগুলোকে অতিরিক্ত ভোগ কমাতে হবে। দ্বিতীয়ত, ইস্পাত, সিমেন্ট ও অ্যালুমিনিয়ামের মতো বেশি জ্বালানি-নির্ভর শিল্পে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি ও নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। তৃতীয়ত, বায়ুমণ্ডলে ইতোমধ্যে জমে থাকা কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেনসহ অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণের প্রযুক্তি উন্নত করতে হবে।
তিনি বলেন, জলবায়ু সমাধানের সূচনা হতে পারে কম ভোগ থেকে। উদাহরণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চমাত্রার গাড়িনির্ভর জীবনযাত্রার কথা উল্লেখ করেন। বিশ্বের সবাই যদি যুক্তরাষ্ট্রের হারে গাড়ির মালিক হয়, তাহলে পৃথিবীতে গাড়ির সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যবহারের হার বাড়লেও খনিজ উত্তোলন, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও পরিবেশের ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।
ঘরবাড়ির জ্বালানি ব্যবহারও জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর গবেষণা অনুযায়ী, প্রাকৃতিক গ্যাসের চুলা থেকে মিথেনসহ বিভিন্ন দূষক নির্গত হতে পারে। গ্যাসের চুলার পরিবর্তে ইন্ডাকশন কুকটপ ব্যবহারের মাধ্যমে এ ধরনের দূষণ কমানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন জ্যাকসন। তাঁর মতে, বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে গবাদিপশু পালন মিথেন নির্গমনের বড় উৎস। তাই গরুর মাংস ও দুগ্ধজাত খাবারের ব্যবহার কমিয়ে উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের দিকে ঝোঁকার মাধ্যমে জলবায়ু ও স্বাস্থ্য—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে ভোগ ও নির্গমন কমানোর পাশাপাশি সরকারের নীতিগত পদক্ষেপও জরুরি। জ্যাকসনের মতে, কার্বন ও মিথেন দূষণের ওপর মূল্য আরোপ এবং দূষণকারী শিল্পকে নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।
তবে তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে শুধু ভবিষ্যতের নির্গমন কমানো যথেষ্ট হবে না। বায়ুমণ্ডলে ইতোমধ্যে জমে থাকা গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণের প্রযুক্তিও বড় পরিসরে তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে মিথেনের ক্ষেত্রে দ্রুত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মিথেন বায়ুমণ্ডলে তুলনামূলকভাবে অল্প সময় থাকে। মানবসৃষ্ট মিথেন নিঃসরণ ব্যাপকভাবে কমানো গেলে এক থেকে দুই দশকের মধ্যে এর ঘনত্ব প্রাক্-শিল্প যুগের কাছাকাছি নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্যাকসনের ভাষায়, বায়ুমণ্ডল পুনরুদ্ধার করা শুধু জলবায়ু রক্ষার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন রক্ষার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বায়ুদূষণ প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার পরও তিনি জলবায়ু সংকট মোকাবিলার লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর পক্ষে নন। বরং অতিরিক্ত ভোগ কমানো, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার, দূষণকারী শিল্পের রূপান্তর এবং বায়ুমণ্ডল থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস অপসারণ—এই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।




