

প্রাচীন চিন্তায় ঘর ও রাজনীতি
BD Feature, Writter
পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রচিন্তার প্রথাগত ইতিহাসে আমরা সাধারণত অ্যারিস্টটল বা প্লেটোর সেই গাম্ভীর্যপূর্ণ আলোচনার দেখা পাই, যা মূলত রাষ্ট্রনীতি, আইন কিংবা নাগরিক অধিকারকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। কিন্তু যে গৃহকোণে আমাদের অস্তিত্বের শুরু, যে রান্নাঘরের চুল্লিপাড় থেকে প্রাত্যহিক জীবনের রসদ সংগৃহীত হয়, দর্শনের বিশাল আঙিনায় সেই ‘ঘর’ কেন যেন ব্রাত্যই রয়ে গেছে। ইতিহাসের অলিগলি খুঁড়লে দেখা যায়, দার্শনিকদের একটি বিশাল অংশ পুরুষ হওয়ায় তারা ঘরোয়া জীবনকে দর্শনের আলোচনার উপযুক্ত মনে করেননি। কিন্তু প্রাচীন জ্ঞানতত্ত্বের শিকড়ে দৃষ্টি দিলে আমরা এক বিস্ময়কর সত্যের মুখোমুখি হই—সেখানে ঘর কেবল বিশ্রামের স্থান নয়, বরং তা ছিল নৈতিকতা ও মানব উন্নয়নের সূতিকাগার। আমাদের এই আধুনিক জীবনের যান্ত্রিকতায় দাঁড়িয়ে ঘরের সেই বিস্মৃত দর্শনকে পুনরায় পাঠ করা কেন অপরিহার্য? রাষ্ট্রীয় সংসদ বা সেনেটের চেয়ে ঘরের ভেতরের প্রাত্যহিক কাজগুলো কি আমাদের মানুষ হিসেবে পূর্ণতা পাওয়ার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?
‘ইকোনমিকস’ বা গৃহপরিচালনা বিজ্ঞানের হারানো ব্যঞ্জনা
বর্তমানে ‘ইকোনমিকস’ বা অর্থনীতি বলতে আমরা কেবল বাজারব্যবস্থা বা মুদ্রাস্ফীতির জটিল সমীকরণ বুঝি। কিন্তু এই শব্দের মূলে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক শব্দ ‘oikonomika’ (অইকোনমিকা), যার আক্ষরিক অর্থ ছিল ‘গৃহপরিচালনা বিজ্ঞান’। প্রাচীন দার্শনিকদের কাছে ঘরোয়া ব্যবস্থাপনা ছিল এক গভীর তাত্ত্বিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি কেবল বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও নান্দনিক জীবন যাপনের প্রাথমিক পাঠশালা হিসেবে গণ্য হতো।

Gynaeceum scene depicted on an epinetron, a thigh guard worn by women during wool-working. Courtesy the Louvre, Paris
"উৎপত্তিগত দিক থেকে অর্থনীতি বা গৃহপরিচালনা বিজ্ঞান রাজনীতির চেয়েও অগ্রবর্তী; কারণ এর কার্যাবলি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য যেহেতু একটি গৃহই হলো একটি নগরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।"
টাকা-পয়সার বাইরেও ঘর কেন দার্শনিকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল? কারণ তারা বিশ্বাস করতেন, একটি বৃহত্তর সামাজিক বা রাজনৈতিক ইউনিট হিসেবে গড়ে ওঠার আগে ঘর হলো সেই ভিত্তি, যেখানে মানুষ হিসেবে আমাদের প্রথম নৈতিক বিকাশ ঘটে।
রাষ্ট্র নয়, গৃহই হলো সবকিছুর মূলে
অ্যারিস্টটলের বিখ্যাত ‘Politics’ গ্রন্থে তিনি রাষ্ট্রকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দিলেও, তার নামে প্রচলিত (যদিও এর লেখক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে) ‘Economics’ বইটির প্রথম খণ্ড এক ব্যতিক্রমী দাবি পেশ করে। সেখানে বলা হয়েছে, গৃহস্থালি বা ঘর হলো রাষ্ট্রের চেয়েও মৌলিক এবং প্রাচীন। কারণ অনেকগুলো ঘর বা গৃহস্থালির পুঞ্জীভূত রূপই হলো একটি রাষ্ট্র।

Statuette of a woman leaning on a pillar, Greek, Hellenistic period, late 3rd or early 2nd century BCE. Courtesy the MFA Boston
এই ধারণার রেশ ধরে ১৭শ শতাব্দীর ভেনিসীয় চিন্তাবিদ লুক্রেজিয়া মারিনেলা এক চমৎকার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তিনি মনে করতেন, একটি নগর বা রাষ্ট্র তখনই সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে যখন তার প্রতিটি ঘর সুশৃঙ্খল থাকে। তার মতে, রাষ্ট্র যেহেতু ঘরেরই একটি বৃহত্তর সংমিশ্রণ, তাই গৃহপরিচালনায় দক্ষ নারীরাই প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রের সুশৃঙ্খল অগ্রগতির নেপথ্য কারিগর। অ্যারিস্টটল যদিও নারী, শিশু এবং দাসদের বিচার বা ন্যায়বিচার নিয়ে প্রামাণিকভাবে আলোচনা করার মতো ‘পূর্ণ যৌক্তিক সক্ষমতা’ নেই বলে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে রেখেছিলেন, কিন্তু মারিনেলার বিশ্লেষণ সেই ঘরোয়া পরিমণ্ডলকেই রাজনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
রন্ধনশৈলী যখন দর্শনের পরিপূরক ১৭শ শতাব্দীর মেক্সিকান দার্শনিক সর জুয়ানা ইনেস দে লা ক্রুজ দর্শনের বিমূর্ত তত্ত্বের সাথে ব্যবহারিক জীবনের এক মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তিনি তাত্ত্বিক জ্ঞানের অহংকারকে চ্যালেঞ্জ করে বলেছিলেন যে, দর্শন কেবল লাইব্রেরির তাকে বন্দি থাকার বিষয় নয়। তার মতে, জ্ঞান অর্জনের জন্য রান্নাঘরের অভিজ্ঞতারও বিশেষ প্রয়োজন রয়েছে। তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, অ্যারিস্টটল যদি রান্না শিখতেন, তবে তার দার্শনিক তত্ত্বগুলো আরও উন্নত ও জীবনঘনিষ্ঠ হতো।
রান্নাঘরের আগুনের উত্তাপ, বিভিন্ন উপাদানের সুক্ষ্ম সংমিশ্রণ এবং ধৈর্য ধরে রান্নার প্রক্রিয়া যে প্রজ্ঞা ও জীবনবোধ শেখায়, তা কেবল পুঁথিগত বিদ্যায় সম্ভব নয়। তাত্ত্বিক জ্ঞানের সাথে এই গার্হস্থ্য অভিজ্ঞতার সংযোগ একজন চিন্তাবিদকে আরও সংবেদনশীল ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
গার্হস্থ্য শ্রম কেবল নারীর দায় নয় প্রাচীন সমাজব্যবস্থায় লিঙ্গভিত্তিক কাজের সীমানা যতটা কঠোর ভাবা হয়, স্টোয়িক দার্শনিকদের চিন্তায় তা ছিল অনেকটা নমনীয়। হিয়েরোক্লিস এবং মুসোনিয়াস রুফাস মনে করতেন, গৃহস্থালি কাজ কেবল নারীদের জন্য বরাদ্দ থাকা উচিত নয়। হিয়েরোক্লিস অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, যেসব কাজে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন হয়, সেগুলোতে পুরুষদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকা বাঞ্ছনীয়। এটি কেবল ‘সাহায্য’ করা নয়, বরং দাম্পত্যের সীমানা বিলোপের এক অনন্য দর্শন।
"উৎসবের সময় স্ত্রী যেমন স্বামীর সাথে ধর্মীয় আচার পালন করবে, তেমনি স্বামী যখন অসুস্থ বা প্রবাসে থাকবে, স্ত্রী গৃহের শৃঙ্খলা বজায় রাখবে... আবার যেসব কাজ অত্যন্ত ক্লান্তিকর এবং শারীরিক সামর্থ্যের প্রয়োজন হয়, যেমন পেষণ (grinding), ময়দা মাখা (kneading), কাঠ চেরা, জল তোলা, আসবাবপত্র সরানো বা বিছানা ঝাড়া এই কাজগুলোতে স্বামীর অংশ নেওয়া উচিত।"
প্রাচীন এই চিন্তাবিদদের মতে, দাম্পত্যের সার্থকতা নিহিত ছিল একে অপরের কাজের পরিপূরক হয়ে ওঠার মধ্যে, যা আধুনিক জেন্ডার সমতার ধারণাকেও হার মানায়।
বিবাহ একটি আত্মিক ও বৈষয়িক অংশীদারিত্ব মুসোনিয়াস রুফাসের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবাহ কেবল বংশ রক্ষার কোনো সামাজিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি গভীর মানসিক ও বৈষয়িক সাহচর্য। তিনি একে ‘নিখুঁত সাহচর্য’ (perfect companionship) হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, স্বামী এবং স্ত্রীর মধ্যে কোনো কিছুই ব্যক্তিগত বা পৃথক থাকা উচিত নয় এমনকি তাদের নিজেদের শরীর থেকে শুরু করে সম্পদ পর্যন্ত সবকিছুই সাধারণ বা অভিন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয়।
আজকের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজে যেখানে সম্পর্কের স্থায়িত্ব প্রতিনিয়ত প্রশ্নের সম্মুখীন, সেখানে রুফাসের এই ‘অভিন্ন স্বার্থের’ দর্শন আমাদের শেখায় যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অংশীদারিত্বই হলো একটি শক্তিশালী গৃহের মূল ভিত্তি। যখন এই আত্মিক সংযোগ বিঘ্নিত হয়, তখন একত্রে বসবাস করলেও সেই গৃহের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে যায়।

Terracotta loom weight, Lydian, 6th century BCE or later. Courtesy the Met Museum, New York
গৃহের দর্শন পুনরুদ্ধার প্রাচীন এই দার্শনিক সত্যগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঘর কোনো তুচ্ছ বা নিভৃত ব্যক্তিগত কোণ নয়। এটিই হলো আমাদের অস্তিত্বের প্রথম গবেষণাগার। ‘ইকোনমিকস’ যখন গৃহপরিচালনার বিজ্ঞানে রূপ নেয়, ঘর যখন রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল হিসেবে স্বীকৃত হয় এবং রান্নাঘর যখন প্রজ্ঞার উৎসে পরিণত হয় তখন আমাদের প্রতিদিনের অতি সাধারণ ঘরোয়া কাজগুলোও এক গভীর দার্শনিক মর্যাদায় ভূষিত হয়।
ঘরকে কেবল একঘেয়ে দায়িত্ব বা বাধ্যবাধকতা হিসেবে না দেখে যদি আমরা একে মানবিক উৎকর্ষের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করি, তবেই হয়তো আমাদের যান্ত্রিক জীবন পূর্ণতা পাবে। সবশেষে একটি প্রশ্ন রেখেই শেষ করছি: আমাদের প্রাত্যহিক ঘরোয়া কাজগুলো কি কেবল যান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা, নাকি এগুলোই আমাদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ওঠার সেই নিভৃত অথচ নিশ্চিত পথ?
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







