

২০ শতকের মা এবং জোরপূর্বক দত্তক গ্রহণের সামাজিক প্রেক্ষাপট
একটি লুকানো ইতিহাসের উন্মোচন
বিংশ শতাব্দীর সামাজিক ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার এবং বেদনাদায়ক অধ্যায় হলো অবিবাহিত মায়েদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জোরপূর্বক দত্তক (Forced Adoption) প্রক্রিয়া। সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার (Keir Starmer) হাউজ অফ কমন্সে এই ঐতিহাসিক অন্যায়ের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। তিনি এই ঘটনাকে "আমাদের ইতিহাসের একটি কলঙ্ক" (a stain on our history) হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র তার ক্ষমতা ব্যবহার করে সমাজের সবচেয়ে অসহায় নারী ও শিশুদের ওপর চরম নিপীড়ন চালিয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী তিন দশকে কেবল যুক্তরাজ্য এবং আয়ারল্যান্ডেই আনুমানিক ৩ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ শিশু তাদের মায়েদের কোল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বিচ্ছেদ ছিল পদ্ধতিগত এবং বলপ্রয়োগের ফসল। সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার মূলে ছিল কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ এবং কাঠামোগত বৈষম্য, যা নারীদের প্রান্তিককরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
"যারা এই নিষ্ঠুর ব্যবস্থার শিকার হয়েছেন, আমি তাঁদের বলছি: এই লজ্জা আপনার নয়। এই লজ্জা কখনোই আপনার ছিল না। এই লজ্জা আমাদের।" কিয়ার স্টারমার
এই ইতিহাসের গভীরে প্রবেশ করার জন্য আমাদের প্রথমেই বুঝতে হবে কীভাবে ভাষাগত ব্যবহারের মাধ্যমে একক মায়েদের ওপর সামাজিক ও নৈতিক কলঙ্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
প্রান্তিককরণের ভাষা: 'অবৈধতা' এবং 'অবিবাহিত মাতৃত্ব'
২০ শতকের মাঝামাঝি সময়ে একক মায়েদের প্রতি সামাজিক মনোভাব গঠনে ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণমূলক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সে সময় “অবিবাহিত মা” (Unmarried Mother) শব্দটি কেবল একজন নারীর বৈবাহিক অবস্থার পরিচয় বহন করত না; বরং তাঁকে নৈতিকভাবে বিচ্যুত ও সামাজিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। এর ফলে অনেক নারী সামাজিক বর্জন, বৈষম্য এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দাতব্য সংস্থার শর্তসাপেক্ষ সহায়তার মুখোমুখি হতেন। একইভাবে “অবৈধ সন্তান” (Illegitimate Children) শব্দটি নবজাতক শিশুর ওপর জন্মের মুহূর্ত থেকেই একটি নেতিবাচক সামাজিক ও আইনি পরিচয় আরোপ করত, যা অনেক দেশে উত্তরাধিকার, নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও বৈষম্যের কারণ ছিল। জেন্ডার স্টাডিজের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাষা ও ধারণাগুলোকে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। কারণ, সন্তান জন্মের দায় ও সামাজিক কলঙ্কের প্রধান বোঝা নারীদের ওপরই চাপানো হতো, অথচ অনেক ক্ষেত্রে পিতার দায়িত্ব ও জবাবদিহি তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত থাকত। একই সঙ্গে কিছু রাষ্ট্র ও সমাজে একক মায়েদের ‘কল্যাণভোগী’ বা welfare spongers হিসেবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হতো, যা তাঁদের প্রতি বিদ্যমান সামাজিক পূর্বধারণাকে আরও শক্তিশালী করত এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিত। তবে উল্লেখ্য, এসব শব্দ ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্দিষ্ট সময়, সমাজ ও আইনি কাঠামোর প্রতিফলন; বর্তমান সময়ে বহু দেশে এগুলোকে বৈষম্যমূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং অধিকতর সম্মানজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত বাধা: পুরুষ উপার্জনকারীর মডেল
তৎকালীন কল্যাণ রাষ্ট্র (Welfare State) এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল যা মূলত 'পুরুষ উপার্জনকারীর মডেল'-এর ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এই মডেলে আর্থিক সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সুবিধাগুলো কেবল বিবাহিত নারী এবং বিধবাদের জন্যই বরাদ্দ ছিল।
একক মায়েদের জন্য আর্থিক স্বাধীনতা কেন প্রায় অসম্ভব ছিল, তার প্রধান কারণগুলো হলো:
আর্থিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা: তৎকালীন অর্থনীতি একক নারীদের স্বাধীনভাবে উপার্জনের মাধ্যমে সচ্ছল জীবনযাপনের সুযোগ দিত না, বিশেষ করে যদি তাঁদের শিশু সন্তান থাকে।
গৃহায়ন ও সহায়তার অভাব: সরকার একক মায়েদের জন্য আবাসন বা কোনো ধরনের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেনি, যা তাঁদের চূড়ান্ত অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দিত।
নেতিবাচক সামাজিক ভাবমূর্তি: একক মায়েদের প্রায়শই 'অলস' এবং রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখা হতো। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদের কর্মক্ষেত্রে এবং সামাজিকভাবে আরও বেশি বিচ্ছিন্ন করে ফেলত।
এই কাঠামোগত অভাবই শেষ পর্যন্ত মায়েদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে বা 'মাদার-অ্যান্ড-বেবি হোমস'-এর অন্ধকার গণ্ডিতে প্রবেশ করতে বাধ্য করত।
প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ: মাদার-অ্যান্ড-বেবি হোমস এবং চার্চের ভূমিকা
যুক্তরাজ্য এবং আয়ারল্যান্ডে একক মায়েদের নিয়ন্ত্রণে ধর্মীয় (ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট) ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্থাগুলো এক শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল।
গোপনীয়তা ও পদ্ধতিগত নিয়ন্ত্রণ: এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারীদের পাঠানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল তাঁদের সমাজ থেকে 'লুকিয়ে' রাখা। এই গোপনীয়তা (Secrecy) কেবল নারীর সম্মান রক্ষার জন্য ছিল না, বরং এটি ছিল পুরো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা এবং তার ত্রুটিগুলোকে আড়াল করার একটি কৌশল।
সরকারি ভর্তুকি ও প্রবৃদ্ধি: ১৯৪৩ সালে ইংল্যান্ডে এবং ১৯৪৪ সালে স্কটল্যান্ডে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই হোমগুলোতে সরকারি ভর্তুকি দেওয়া শুরু করে। এর ফলে এই হোমগুলোর সংখ্যা এবং প্রভাব বহুগুণ বেড়ে যায় এবং দত্তক গ্রহণের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়।
অধিকারের বৈষম্য: পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি জৈবিক মায়ের অধিকারের চেয়ে দত্তক গ্রহণকারী বাবা-মায়ের অধিকারকে অগ্রাধিকার দিত। জন্মদাত্রী মায়েদের প্রায়ই 'উচ্ছৃঙ্খল' বা 'স্বার্থপর' হিসেবে অভিযুক্ত করে তাঁদের থেকে শিশুদের সরিয়ে নেওয়াকে বৈধতা দেওয়া হতো।
দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট
১৯৭০-এর দশক থেকে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে আইনি কাঠামোয় ধীরে ধীরে এমন কিছু পরিবর্তন আসে, যা একক মায়েদের সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি অর্জনের পথকে সহজ করে। ১৯৭২ সালে আয়ারল্যান্ডে অবিবাহিত মায়েদের জন্য সীমিত পরিসরে একটি ভাতা চালু করা হয়, যদিও অনেক গবেষকের মতে এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল গর্ভপাত নিরুৎসাহিত করা। এরপর ১৯৭৪ সালে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে একক অভিভাবকদের আবাসনের অধিকার এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সামাজিক সুবিধা আইনগতভাবে স্বীকৃতি পায় এবং ১৯৭৭ সালে স্কটল্যান্ডেও অনুরূপ অধিকার কার্যকর করা হয়। এসব সংস্কার একক মায়েদের প্রতি রাষ্ট্রীয় নীতির পরিবর্তনের সূচনা করলেও অতীতের বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। বর্তমানে একক অভিভাবক পরিবার পশ্চিমা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা। যুক্তরাজ্যের অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ONS)-এর ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে প্রায় ১৫.৪ শতাংশ এবং আয়ারল্যান্ডে প্রায় ২৫ শতাংশ শিশু একক অভিভাবকের পরিবারে বেড়ে উঠছে। তবুও ঐতিহাসিক অন্যায়ের বিচার ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি এখনও সীমিত। ২০২১ সালে আয়ারল্যান্ডের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রের অতীত আচরণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করলেও, সমালোচকদের মতে জোরপূর্বক দত্তক গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে স্বীকার করা হয়নি। একইভাবে ২০২৩ সালে স্কটল্যান্ড ও ওয়েলসের ক্ষমা প্রার্থনার পরও ভুক্তভোগীদের একটি অংশ অভিযোগ করেন যে তাঁদের সাক্ষ্য, ক্ষতিপূরণ এবং কার্যকর ন্যায়বিচারের দাবিগুলো যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। এর বিপরীতে উত্তর আয়ারল্যান্ডে চালু হওয়া Truth and Recovery Programme অতীতের ঘটনা উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা নথিভুক্তকরণ এবং পুনর্মিলনের প্রচেষ্টার কারণে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণ
২০ শতকে একক মায়েদের প্রতি সংঘটিত বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক নিপীড়নের ইতিহাস কেবল ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির বিবরণ নয়; এটি সমাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পারস্পরিক প্রভাবেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, সামাজিক কলঙ্ক বা ‘লজ্জা’ কীভাবে আইন, নীতি এবং সামাজিক রীতিনীতির মাধ্যমে বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। তাই অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতাকে স্বীকৃতি দেওয়া ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য সরকার অতীতের ক্ষত নিরাময় ও ঐতিহাসিক সত্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে National Online Resource দত্তক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পুরোনো নথি ও পারিবারিক তথ্য অনুসন্ধানের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি Testimonials Project-এর মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারে এবং একই ধরনের অন্যায় পুনরাবৃত্তি রোধে সচেতন হয়। সর্বোপরি, এই ইতিহাসের মূল শিক্ষা হলো কোনো ব্যক্তি বা শিশুকে জন্মপরিস্থিতির কারণে সামাজিকভাবে হেয় করা বা অধিকার থেকে বঞ্চিত করা ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পরিপন্থী। অতীতের অন্যায় স্বীকার, সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
এই ভাবনাকেই সংক্ষেপে প্রকাশ করে বহুল উদ্ধৃত উক্তিটি: “The shame is not yours. The shame was never yours. The shame is ours.”
অর্থাৎ লজ্জা ভুক্তভোগীর নয়; সেই দায় সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের, যারা বৈষম্যকে টিকিয়ে রেখেছিল।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!






