সাধারণ মানুষের নাস্তিক: ফরাসি পাদ্রীর গোপন ডায়েরি যা কাঁপিয়ে দিয়েছিল সিংহাসন

১৭১৬ সালের এক রবিবারের সকাল। উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের এক নিভৃত গ্রাম এত্রেপিনি (Étrépigny)। গির্জার মিম্বরে দাঁড়িয়ে প্রথাগত প্রার্থনা পরিচালনা করছেন পাদ্রী জঁ মেলিয়ে (Jean Meslier)। সেই সময়ের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্থানীয় লর্ড বা ভূস্বামীর মঙ্গল কামনা করা ছিল যাজকদের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। কিন্তু সেই জনপদের লর্ড আন্তোনিও ডি তূলি ছিলেন এক চরম অত্যাচারী; দরিদ্র ও অনাথদের ওপর তার নিপীড়ন ছিল এক সর্বজনবিদিত ও প্রকাশ্য বাস্তবতা। মেলিয়ে সেদিন প্রার্থনা করলেন ঠিকই, কিন্তু এক অভূতপূর্ব ও প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপের মোড়কে। তিনি উপস্থিত গ্রামবাসীদের আহ্বান জানালেন লর্ডের জন্য প্রার্থনা করতে—তবে তার দীর্ঘায়ু বা ক্ষমতা কামনায় নয়, বরং তিনি সাধারণ মানুষের ওপর যে ভয়াবহ অন্যায় করেছেন, ঈশ্বর যেন তাকে দিয়ে তার প্রায়শ্চিত্ত করান, সেই কামনায়।
এই ক্ষুদ্র কিন্তু সাহসী ঘটনাটি মেলিয়ের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুটি উন্মোচিত করে: ক্ষমতা কেবল শারীরিক বলপ্রয়োগ বা আইনের শক্তিতে টিকে থাকে না; এটি মূলত টিকে থাকে কারণ এটি ধর্মের পবিত্রতার মাধ্যমে নিজেকে ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ করে নিতে সক্ষম হয়। গির্জা ছিল সেই যুগের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্তম্ভের এক অবিচ্ছেদ্য ভিত্তি, যা পবিত্রতার আবরণে অন্যায়কে বৈধতা দান করত।
দিনের বেলায় যাজক, রাতে বিপ্লবী লেখক: জঁ মেলিয়ের দ্বৈত জীবন
জঁ মেলিয়ে প্রায় ৪০ বছর ধরে এত্রেপিনি গ্রামে একজন আদর্শ ও নিষ্ঠাবান পাদ্রীর জীবন অতিবাহিত করেছেন। ১৬৬৪ সালে এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মেলিয়ের পক্ষে সেই যুগে গির্জার প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার কোনো বাস্তব উপায় ছিল না। ধর্মত্যাগ বা আপোসহীনতা মানেই ছিল অবধারিত নির্বাসন, ধ্বংস অথবা তার চেয়েও ভয়াবহ কোনো পরিণতি। তাই মেলিয়ে পাদ্রী হিসেবে নিজের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার বৌদ্ধিক সত্তায় তিনি ছিলেন এক আপোসহীন বস্তুবাদী ও নাস্তিক। ১৭১৬ সালের সেই ঘটনার পর যখন তাকে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শাসন করা হয়, তখন থেকেই তিনি তার সংগ্রামের রণভূমি পরিবর্তন করেন—মিম্বর ছেড়ে তিনি হাতে তুলে নেন কলম। এই দ্বৈত জীবন ছিল মূলত তার টিকে থাকার এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে সত্য লিখে যাওয়ার এক নিগূঢ় কৌশল। তিনি জানতেন, জীবিত অবস্থায় এই চরম সত্য ব্যক্ত করলে তার কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে। তাই তিনি তার সুবিশাল পাণ্ডুলিপি লিখে রেখে গিয়েছিলেন নিজের মৃত্যুর পর পড়ার জন্য।
তিনি তার পাণ্ডুলিপির সূচনাতেই লিখেছিলেন:
"হে আমার প্রিয় সুহৃদগণ, মানুষের আচার-আচরণ, শাসনব্যবস্থা ও ধর্ম নিয়ে আমার অন্তরের নিগূঢ় সত্যগুলো জীবদ্দশায় ব্যক্ত করার অনুমতি আমার ছিল না—কেননা তার পরিণাম হতো ভয়াবহ ও শোকাবহ। তাই আমি স্থির করেছি, আমার মৃত্যুর পরেই আমি আপনাদের নিকট সত্যের দ্বার উন্মোচন করব।"
শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ধর্ম: যখন অন্যায়কে 'আশীর্বাদ' করা হয়
মেলিয়ের মূল দর্শন ছিল অত্যন্ত গভীর ও দূরদর্শী। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদ টিকে থাকার মূল কারিগর হলো ধর্ম। ধর্ম মানুষের পার্থিব দুঃখ-কষ্টকে ‘পুণ্য’ বা পরকালের ‘পুরস্কারের পরীক্ষা’ হিসেবে প্রচার করে শোষিত মানুষকে মোহগ্রস্ত করে রাখে। মেলিয়ের মতে, আধিপত্যবাদী শক্তি কেবল কর বা শাসনের মাধ্যমে টিকে থাকে না; এটি টিকে থাকে কারণ এটি নিজের শোষণকে ‘ঐশ্বরিক বিধান’ হিসেবে প্রতিপন্ন করতে পারে। চার্চ এবং রাজতন্ত্রের এই অশুভ আঁতাত শ্রেণিবৈষম্যকে একটি ‘স্বাভাবিক নিয়ম’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। মেলিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, যতক্ষণ না ধর্মের এই মায়াজাল ছিন্ন করা যাচ্ছে, ততক্ষণ মানুষের রাজনৈতিক মুক্তি অসম্ভব।
স্বর্গ ও নরক এখানেই: পরকালের ধারণাকে মর্ত্যে নামিয়ে আনা
মেলিয়ে স্বর্গ ও নরকের প্রচলিত অধিবিদ্যক ধারণাকে সমূলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তার কাছে স্বর্গ আর নরক কোনো পরজাগতিক রহস্য নয়, বরং এই পৃথিবীরই এক রূঢ় সামাজিক বাস্তবতা। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, সমাজে একদল মানুষ সমস্ত বিলাসিতা আর প্রাচুর্যের মধ্যে ‘স্বর্গে’র সুখ ভোগ করছে, আর অন্যদিকে দরিদ্র ও মেহনতি মানুষ অভাব, অনাহার আর অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে মর্ত্যেই ‘নরক’ যন্ত্রণা ভোগ করছে। এই বিপরীতধর্মী অবস্থানের কারণগুলো কোনো ঐশ্বরিক বিচার নয়, বরং সম্পূর্ণ পার্থিব ও রাজনৈতিক। মেলিয়ে বিশ্বাস করতেন, যদি নরকের কারণগুলো পার্থিব হয়, তবে তার সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে। পরকালের কাল্পনিক শান্তির আশায় ইহকালের মুক্তিকে বিসর্জন দেওয়া তার চোখে ছিল চরম মূর্খতা।
মার্ক্স ও ডারউইনের অনেক আগেই এক সাম্যবাদী ও প্রকৃতিবাদী চিন্তা
মেলিয়ে ছিলেন তার সময়ের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা এক আধুনিক চিন্তাবিদ। গবেষকরা তাকে ‘মার্ক্স-পূর্ব মার্ক্সবাদী’ বলে অভিহিত করেন। মঠের সন্ন্যাসীদের যৌথ জীবনযাপন দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে, ব্যক্তিগত সম্পত্তিই হলো সমস্ত সামাজিক অনাচারের মূল উৎস। তিনি গোটা সমাজের জন্য সম্পদের ‘যৌথ মালিকানা’ বা সাম্যবাদের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এমনকি ডারউইনের বহু আগেই তিনি এক প্রকার বস্তুবাদী প্রকৃতিবাদ (Materialist Naturalism) প্রচার করেছিলেন। তার মতে, আত্মার কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই; এটি শরীরেরই অংশ এবং শরীরের মৃত্যুর সাথেই আত্মা বিলীন হয়ে যায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, পদার্থের নিজস্ব গতি এবং বৈচিত্র্যময় বিন্যাসই এই মহাবিশ্বের অস্তিত্বের জন্য যথেষ্ট, এর জন্য কোনো অলৌকিক স্রষ্টার প্রয়োজন নেই। তার এই চিন্তা ছিল প্রকৃতিকে ধর্মতত্ত্বের প্রভাব থেকে মুক্ত করার এক সাহসী প্রচেষ্টা।
ভলতেয়ারের বিকৃতি এবং ইতিহাসের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া সত্য
১৭২৯ সালে মেলিয়ের মৃত্যুর পর তার পাণ্ডুলিপিগুলো মানুষের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে এবং একসময় তা দার্শনিক ভলতেয়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৭৬২ সালে ভলতেয়ার মেলিয়ের লেখার একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশ করেন, যা মেলিয়েকে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি দান করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, ভলতেয়ার মেলিয়ের উগ্র বৈপ্লবিক রাজনৈতিক চিন্তা এবং কট্টর বস্তুবাদকে অনেকটা লঘু করে পেশ করেছিলেন। তিনি পাণ্ডুলিপিটির শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘টেস্টামেন্ট’ (Testament), যা মেলিয়ের বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কর্মসূচিকে একজন মুমূর্ষু ব্যক্তির ধর্মীয় স্বীকারোক্তিতে রূপান্তর করার একটি কৌশলী প্রচেষ্টা ছিল। ভলতেয়ার মেলিয়েকে কেবল একজন ধর্মবিরোধী যাজক হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তার সাম্যবাদী ও আমূল পরিবর্তনকামী রাজনৈতিক সত্তাটিকে সুকৌশলে আড়াল করেছিলেন। এভাবেই ইতিহাসের এক মহান বিপ্লবীর মূল বার্তা দীর্ঘকাল খণ্ডিত অবস্থায় রয়ে গিয়েছিল।
আনুগত্যের শেকল ভাঙার এক শেষ সুযোগ
১৭২৯ সালে যখন জঁ মেলিয়ে মৃত্যুবরণ করেন, তখন গির্জার নথিপত্রে তার মৃত্যুসংবাদ পর্যন্ত নথিবদ্ধ করা হয়নি—যেন তাকে ইতিহাস থেকে চিরতরে মুছে ফেলার এক সম্মিলিত প্রয়াস চালানো হয়েছিল। কিন্তু তার সত্যনিষ্ঠ কলম সেই প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। মেলিয়ের জীবন আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতার শোষণ কেবল অস্ত্র দিয়ে হয় না, বরং তা হয় আমাদের অবচেতন বিশ্বাস আর আনুগত্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, আমাদের শ্রম ও সাধনা দিয়েই শাসকের ক্ষমতা নির্মিত হয়; অথচ সেই ক্ষমতার দম্ভ আমাদেরই শোষণের পথ প্রশস্ত করে।
আজকের এই আধুনিক যুগে দাঁড়িয়েও কি আমরা বলতে পারি যে আমরা পরিপূর্ণ মুক্ত? নাকি আমরা কি আজও এমন কোনো অদৃশ্য ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রেখেছি যা প্রকৃতপক্ষে আমাদেরই শোষণের পথ প্রশস্ত করছে? মেলিয়ের সেই গোপন ডায়েরি আজও আমাদের চিন্তার জগতে এক প্রবল অস্বস্তি ও জিজ্ঞাসার জন্ম দেয়।





