

আমাদের নীতিবোধ কি আমাদেরই অন্ধ করে দিচ্ছে? রাজনীতির বিভেদ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব
"আমরা কি সবাই মিলেমিশে থাকতে পারি না?" ১৯৯২ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের দাঙ্গার সময় রডনি কিংয়ের এই করুণ আকুতি আজ বিশ্বজুড়ে এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সময়ে রাজনীতি এবং ধর্মের নামে মানুষ যেভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে, তাতে মনে হয় আমরা সবাই যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে বাস করছি। কিন্তু কেন ভালো মানুষরা রাজনীতি বা ধর্মের প্রশ্নে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়ায়? কেন আমরা নিজেদের আদর্শকে সবসময় সঠিক মনে করি? সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক জোনাথন হাইট তাঁর গবেষণায় এই বিভেদের মূল কারণগুলো উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন।
হাতি এবং তার সওয়ার: যুক্তি বনাম অনুভূতি
মানুষের মন কীভাবে কাজ করে, তা বোঝাতে হাইট একটি চমৎকার রূপক ব্যবহার করেছেন: একজন সওয়ার এবং একটি বিশালাকার হাতি। এখানে 'সওয়ার' হলো আমাদের সচেতন বিচারবুদ্ধি বা যুক্তি, আর 'হাতি' হলো আমাদের অবচেতন মন, আবেগ এবং তাৎক্ষণিক অনুভূতি।
দীর্ঘদিন ধরে ভাবা হতো যে যুক্তিই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু হাইটের মতে, আসলে 'হাতি' বা আমাদের তাৎক্ষণিক অনুভূতিই সবকিছুর আগে আসে। সওয়ারের কাজ হলো হাতি যেদিকে যেতে চায়, তার সপক্ষে যুক্তি খুঁজে বের করা। একে হাইট বলছেন 'কৌশলগত যুক্তি' (Strategic Reasoning)। যখন কেউ কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয়ে আমাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করে, আমাদের ভেতরের হাতিটি তৎক্ষণাৎ তা প্রত্যাখ্যান করে। এরপর আমাদের ভেতরের সওয়ার বা যুক্তিটি কেবল সেই হাতিকে সমর্থন করার জন্য নানা অজুহাত বা প্রমাণ তৈরি করতে শুরু করে।
হাইট দেখিয়েছেন যে আমরা সবাই আসলে 'আত্মধার্মিক ভণ্ড' (Self-righteous hypocrites)। আমরা অন্যের চোখের তিল খুঁজে পাই, কিন্তু নিজের চোখের তালগাছ দেখি না। আমাদের বিচারবুদ্ধি সত্য খোঁজার বদলে নিজের গ্রুপ বা দলের স্বার্থ রক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকে।
নীতিবোধের ছয়টি ভিত্তি: কার স্বাদ কেমন?
নীতিবোধ বলতে আমরা সাধারণত অন্যকে কষ্ট না দেওয়া (Harm) এবং ন্যায়বিচারকে (Fairness) বুঝি। কিন্তু হাইট দাবি করেছেন, নীতিবোধ বা মোরালিটি এর চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। তিনি নীতিবোধকে জিহ্বার 'স্বাদ কোরকের' (Taste buds) সাথে তুলনা করেছেন। যেমন আমাদের জিহ্বা মিষ্টি, টক, নোনতা বা তিতা স্বাদের পার্থক্য বুঝতে পারে, তেমনি আমাদের মনও বিভিন্ন নৈতিক বিষয়ের প্রতি সংবেদনশীল।
হাইটের মতে, এই নৈতিক ভিত্তি ছয়টি:
১. যত্ন ও ক্ষতি (Care/Harm): অসহায় বা আর্তের প্রতি সহানুভূতি এবং নিষ্ঠুরতার বিরোধিতা করা। এটি শিশুদের রক্ষার বিবর্তনীয় তাড়না থেকে এসেছে। ২. ন্যায়বিচার ও প্রতারণা (Fairness/Cheating): এটি মূলত আনুপাতিক হার মেনে চলার মানসিকতা। যারা কাজ করে না কিন্তু সুবিধা নেয়, মানুষ তাদের পছন্দ করে না। ৩. আনুগত্য ও বিশ্বাসঘাতকতা (Loyalty/Betrayal): নিজের দল বা গোষ্ঠীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা। যারা নিজের দলের সাথে বেইমানি করে, তাদের প্রতি মানুষ ঘৃণা পোষণ করে। ৪. কর্তৃত্ব ও অবাধ্যতা (Authority/Subversion): সমাজ বা পরিবারের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য বড়দের বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা। ৫. পবিত্রতা ও অবক্ষয় (Sanctity/Degradation): শরীর বা মনকে কলুষমুক্ত রাখা। এটি মূলত ঘৃণা বা বিতৃষ্ণা (Disgust) থেকে এসেছে । ৬. স্বাধীনতা ও নিপীড়ন (Liberty/Oppression): কর্তৃত্ব যখন স্বৈরশাসনে রূপ নেয়, তখন তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
উদারপন্থী বনাম রক্ষণশীল: কেন এই দ্বন্দ্ব?
হাইটের গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক উদারপন্থীরা (Liberals) মূলত প্রথম দুটি ভিত্তির (যত্ন ও ন্যায়বিচার) ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে চান এবং সামাজিক সাম্য চান। অন্যদিকে, রক্ষণশীলরা (Conservatives) নীতিবোধের সবকটি (ছয়টি) ভিত্তিকেই কমবেশি গুরুত্ব দেন।
রক্ষণশীলদের কাছে আনুগত্য, কর্তৃপক্ষ এবং পবিত্রতার একটি বড় মূল্য আছে, যা উদারপন্থীদের কাছে অনেক সময় 'অন্ধ বিশ্বাস' বা 'নিপীড়ন' বলে মনে হয়। এই যে নীতিবোধের সীমানার পার্থক্য, এটিই বিভেদ সৃষ্টি করে। দুই পক্ষই মনে করে তারা মানবতার কল্যাণে কাজ করছে, কিন্তু তাদের 'কল্যাণ' বা 'ভালোর' সংজ্ঞাই আলাদা।
আমরা কি মানুষ নাকি মৌমাছি?
হাইট বলেন, মানুষ ৯৯ শতাংশ শিম্পাঞ্জি আর ১০ শতাংশ মৌমাছি। শিম্পাঞ্জিরা সাধারণত স্বার্থপর হয়, কিন্তু মৌমাছিরা নিজের চাকের জন্য জীবন দিতেও রাজি থাকে। মানুষের মধ্যেও এই 'মৌমাছি প্রবণতা' আছে, যাকে হাইট বলেছেন 'হাইভ সুইচ' (Hive Switch)। আমরা যখন কোনো বড় দলের অংশ হই সেটা ফুটবল খেলা হোক বা রাজনৈতিক সভা তখন আমাদের ব্যক্তিগত অহম বা 'আমি' হারিয়ে যায় এবং আমরা একটি 'আমরা' বা বড় সত্তার অংশ হয়ে উঠি। এই দলবদ্ধ হওয়ার ক্ষমতা আমাদের সভ্যতা তৈরি করতে সাহায্য করেছে, কিন্তু এটিই আমাদের অন্ধ করে দেয় অন্য দলের প্রতি।
বিভেদ মেটানোর উপায় কী?
আমরা যদি কারো মন পরিবর্তন করতে চাই, তবে তার সওয়ার বা যুক্তির সাথে তর্ক করে লাভ নেই। কারণ যুক্তির পেছনে যে হাতিটি আছে, সেটি আমাদের শত্রু মনে করলে কখনোই কথা শুনবে না। হাইটের পরামর্শ হলো, আগে প্রতিপক্ষের সাথে মানবিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, একে অপরের 'হাতির' সাথে ভাব জমাতে হবে।
যদি আমরা বুঝতে পারি যে রক্ষণশীলরা সমাজকে বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচাতে চান আর উদারপন্থীরা নিপীড়িতকে মুক্তি দিতে চান, তবে দুজনের মধ্যে একটি ভারসাম্য বা 'ইন-ইয়াং' (Yin-Yang) সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। সমাজ রক্ষায় স্থিতিশীলতা এবং সংস্কার দুটোই প্রয়োজন।
পরিশেষে জোনাথন হাইটের বার্তা হলো: আমরা সবাই এক নৌকায় আছি। আমরা যদি অন্যের নীতিবোধের পেছনে থাকা আবেগ বা উদ্দেশ্য বুঝতে চেষ্টা করি, তবে হয়তো আমাদের এই তিক্ত রাজনীতি এবং ধর্মের লড়াই কিছুটা হলেও কমে আসবে। আমাদের নীতিবোধ আমাদের যেন কেবল নিজের দলের সাথে বেঁধে না রাখে, বরং অন্যকে বোঝার চোখও দেয়।
তথ্যসূত্র: জোনাথন হাইট রচিত 'দ্য রাইটিয়াস মাইন্ড: হোয়াই গুড পিপল আর ডিভাইডেড বাই পলিটিক্স অ্যান্ড রিলিজিয়ন' (২০১২) বইটির মূল প্রবন্ধ ও গবেষণার আলোকে।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!






