

রাজনীতি: ক্ষমতার জটিল গোলকধাঁধায় জনমানুষের ভাগ্য
BD Feature, Writter
রাজনীতি কি কেবলই রাষ্ট্র পরিচালনা বা ক্ষমতার পালাবদল, নাকি এর শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত? রিচার্ড গ্যানিসের সংকলিত ‘পলিটিকস ফ্রম এ টু জেড’ (Politics from A to Z) গ্রন্থটি আমাদের এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে। এই বইটিতে রাজনৈতিক মতাদর্শ, ঐতিহাসিক ঘটনা এবং বিশ্ববরেণ্য চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কির একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার স্থান পেয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার এক অন্ধকার দিক আমাদের সামনে উন্মোচিত করে।
গণতন্ত্র কি কেবলই একটি প্রচারণা?
অধ্যাপক চমস্কির মতে, আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশগুলোর, বিশেষ করে আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ মনে করেন না যে তারা নিজেরা দেশ পরিচালনা করছেন। একটি জরিপের বরাত দিয়ে তিনি জানান, প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ মনে করেন সরকার মুষ্টিমেয় কিছু বড় স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হয়, যারা সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না। নির্বাচনের সময় এই চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়; কংগ্রেসে জনপ্রতিনিধিদের প্রতি মানুষের আস্থা অত্যন্ত নিচে (প্রায় ১০-২০ শতাংশের ঘরে) থাকা সত্ত্বেও প্রায় ৯৮ শতাংশ আসীন প্রতিনিধি পুনরায় নির্বাচিত হন। চমস্কি একে মানুষের ‘বিকল্পহীনতা’ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের অভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
এমনকি কর দেওয়ার দিনটিকে যেখানে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে উৎসব হিসেবে পালন করার কথা ছিল, সেখানে আমেরিকায় দিনটি পালিত হয় শোকের দিন হিসেবে। কারণ, মানুষ মনে করে কোনো এক ‘অচেনা শক্তি’ এসে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
প্রোপাগান্ডা এবং রাজনীতির বাজারজাতকরণ
রাজনীতিতে বর্তমানে বিষয়ের চেয়ে প্রচারণাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের বারাক ওবামার নির্বাচনী প্রচারণার উদাহরণ টেনে চমস্কি বলেন, বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলো ওবামার ক্যাম্পেইনকে অ্যাপলকেও ছাড়িয়ে ‘বেস্ট মার্কেটিং অফ দ্য ইয়ার’ পুরস্কার দিয়েছিল। এই প্রচারণায় ‘আশা’ (Hope) এবং ‘পরিবর্তন’ (Change)-এর মতো শব্দগুলো বারবার ব্যবহৃত হয়েছিল, যা প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অর্থহীন ছিল।
চমস্কির মতে, এটি জনগণের উদাসীনতা নয় বরং সমাজের ‘বিঘটন’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ব্যবসায়িক শ্রেণিগুলো মানুষের মন থেকে গণতন্ত্র এবং একে অপরের প্রতি সহমর্মিতার চেতনা মুছে ফেলার জন্য এক বিশাল প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণা চালিয়েছে, যা এখন সফল হতে দেখা যাচ্ছে।
পুঁজিবাদ না কি রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ?
আমরা প্রায়শই বাজার ব্যবস্থা বা পুঁজিবাদের কথা বলি, কিন্তু চমস্কি প্রশ্ন তুলেছেন, আদৌ কি আমরা একটি প্রকৃত বাজার ব্যবস্থায় বাস করি?। তিনি উদাহরণ দেন যে, আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি যে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেট, তা মূলত রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে (যেমন পেন্টাগন) গবেষণার ফসল। এগুলো কয়েক দশক ধরে সরকারি খাতে থাকার পর ব্যক্তিগত মুনাফার জন্য বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়।
বর্তমান অর্থনীতির একটি প্রধান নীতি হলো ‘খরচ এবং ঝুঁকি বহন করবে জনগণ, আর মুনাফা পাবে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান’। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের সময় যখন বড় বড় ব্যাংকগুলোকে সরকারি অর্থে রক্ষা করা হয়েছিল (Too big to fail), তখনই এই চিত্রটি নগ্নভাবে ধরা পড়েছিল । এটি মূলত এক ধরনের ‘লিমিটেড ফর্ম অফ স্টেট ক্যাপিটালিজম’ বা সীমিত আকারের রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ।
ইতিহাসের আদি পাপ: সাম্রাজ্যবাদ ও দাসত্ব
আমেরিকান সমাজব্যবস্থার আলোচনায় চমস্কি একে জর্জ ওয়াশিংটনের ভাষায় একটি ‘শিশু সাম্রাজ্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা গড়ে উঠেছিল আদিবাসীদের নির্মূল করার মধ্য দিয়ে। এছাড়া দাসত্বের ভয়াবহ ইতিহাস এই সমাজের ওপর এখনো প্রভাব ফেলছে। গৃহযুদ্ধের পর দাসত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলেও পরবর্তী কয়েক দশকে কৃষ্ণাঙ্গদের জীবনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার মাধ্যমে পরোক্ষভাবে দাসত্বই পুনরায় চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে আমেরিকার কারাবন্দীদের উচ্চ হারের পেছনেও এই দাসত্বের অবশিষ্টাংশ রয়েছে বলে চমস্কি মনে করেন, যা মূলত কারাগারের অভ্যন্তরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করিয়ে নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া।
বিশ্বব্যবস্থার দ্বিমুখিতা ও সহিংসতা
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানবাধিকার লংঘনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার আগে চমস্কি আমাদের ‘আয়নায় নিজের মুখ দেখতে’ আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার কথা উল্লেখ করে একে ‘ভয়ানক নৃশংসতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর চিলিতে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে একটি নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, যেখানে হাজার হাজার মানুষকে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। চমস্কির মতে, এটি ছিল ‘আমাদের করা সন্ত্রাস’, তাই পশ্চিমা গণমাধ্যমে একে নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না।
রাজনীতির মৌলিক ধারণা: এ থেকে জেড
গ্যানিসের সংকলনে রাজনীতির বিভিন্ন মৌলিক ধারণা উঠে এসেছে যা আমাদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করে:
স্বৈরতন্ত্র (Absolutism): যখন ক্ষমতা একক কোনো কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে এবং নাগরিকদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইন চ্যালেঞ্জ করার অধিকার থাকে না।
অরাজকতা (Anarchism): এর মূল অর্থ হলো ‘নেতা বা শাসকহীন’ অবস্থা। অরাজকতা বিশ্বাসীরা মনে করেন রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং ধর্ম মানুষের স্বাধীনতার পথে অন্তরায়।
আমলাতন্ত্র (Bureaucracy): সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার একে ‘যান্ত্রিক যুক্তি’ (Instrumental reason) হিসেবে দেখেছেন, যা মানুষের সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতাকে সীমিত করে দেয়।
গণতন্ত্র (Democracy): গ্রিক শব্দ ‘দেমোক্রেশিয়া’ থেকে এর উৎপত্তি, যার অর্থ ‘জনগণের শাসন’। মজার ব্যাপার হলো, জেমস ম্যাডিসন এবং আমেরিকার সংবিধানে ‘গণতন্ত্র’ শব্দটি এড়িয়ে চলা হয়েছে কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নিয়ে ভীত ছিলেন।
সাম্রাজ্যবাদ (Imperialism): এটি এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো দূরবর্তী অঞ্চলের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য তাদের উপনিবেশে পরিণত করে।
বিপ্লব ও পরিবর্তনের আন্দোলন
ইতিহাসে পরিবর্তন সবসময়ই এসেছে জনআন্দোলনের হাত ধরে। মহাত্মা গান্ধী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অহিংস প্রতিরোধের (Nonviolent resistance) মাধ্যমে সারা বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তাঁর আদর্শ ছিল শোষণ এবং সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করা। একইভাবে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র আমেরিকায় নাগরিক অধিকার আন্দোলনে গান্ধীর আদর্শকে কাজে লাগিয়ে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে আরব বসন্ত (Arab Spring) মধ্যপ্রাচ্যে স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ২০১০ সালে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল মিশর, লিবিয়া এবং ইয়েমেনে। যদিও পরবর্তীতে ‘আরব বসন্ত’ অনেক ক্ষেত্রে ‘আরব শীতে’ পরিণত হয়েছিল এবং গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দিয়েছিল।
নারীবাদ ও পরিবেশবাদ: নতুন দিগন্ত
রাজনীতি ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি অধিকারের লড়াইও বটে। নারীবাদ (Feminism) তিনটি তরঙ্গের মধ্য দিয়ে ভোটাধিকার থেকে শুরু করে প্রজনন স্বাস্থ্য এবং বর্ণবাদ ও শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। অন্যদিকে, পরিবেশবাদ বা ইকোলজি (Ecology) বর্তমানে একটি রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যেখানে শিল্পায়নের ফলে পৃথিবীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে।
রাজনীতি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। ড. চমস্কির বিশ্লেষণ এবং গ্যানিসের রাজনৈতিক বিশ্বকোষ আমাদের শেখায় যে, ক্ষমতা এবং প্রচারণার জাল ছিঁড়ে সত্যকে জানতে হলে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়ো। ম্যাকিয়াভেলি যেমনটা বলেছিলেন, রাষ্ট্রনায়করা অনেক সময় আদর্শের আবরণে ক্ষমতার লালসা ঢেকে রাখেন, তাই জনগণের দায়িত্ব হলো সেই আবরণ উন্মোচন করা। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক সমাজ তখনই সম্ভব, যখন সাধারণ মানুষ তাদের নিয়তি নির্ধারণে সরাসরি অংশ নিতে পারবে।
Before you go ...
We're building a community of experts dedicated to rebuilding trust and serving the public by making knowledge available to everyone. Join us at the beginning of our journey and receive a curated list of articles in your inbox twice a week. Be among our first subscribers!







