কেন অর্থনৈতিক মুক্তি মানেই রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়?

একটি ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের গল্প
গত শতাব্দীর আশির বা নব্বইয়ের দশকে একটি ধারণা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ধ্রুব সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল— মুক্ত বাজার অর্থনীতি কোনো দেশের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দেবে এবং সেখানে গণতন্ত্রের সুবাতাস বইবে। জোসে কাইরের বাবা যখন ১৯৭০-এর দশকে মেক্সিকোর অটোমোবাইল শিল্পে কাজ করতেন, তখন এই স্বপ্নটি ছিল অত্যন্ত প্রবল। মনে করা হতো, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কমে গেলে নাগরিকরা স্বাবলম্বী হবে এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি তুলবে। কিন্তু ২০২৬ সালের বৈশ্বিক বাস্তবতা বলছে, সেই ধ্রুপদী স্বপ্ন আজ ফিকে হয়ে গেছে। 'ভি-ডেম প্রজেক্ট' (V-Dem Project)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৪১% মানুষ এখন এমন সব দেশে বাস করছেন যা ক্রমেই আরও বেশি স্বৈরতান্ত্রিক বা 'অটোক্রেটাইজিং' হয়ে উঠছে। এমনকি ৯২টি স্বৈরতান্ত্রিক দেশের অনেকগুলোতেই দমনপীড়ন আগের চেয়ে তীব্র হয়েছে। কেন মুক্ত বাজার বা বিশ্বায়ন স্বৈরতন্ত্র দমনে ব্যর্থ হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জোসে কাইরে (José Kaire) তার ‘দ্য রোড টু রিপ্রেশন’ গ্রন্থে এক অন্ধকার সত্য তুলে ধরেছেন।
টেকঅ্যাওয়ে ১: অর্থনৈতিক উদারীকরণ বনাম ক্রমবর্ধমান দমনপীড়ন (The Paradox of Liberalization)
বিখ্যাত নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান এবং ফ্রেডরিখ হায়েকের তত্ত্ব ছিল বেশ সরল: রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কমিয়ে দিলে তা নাগরিকদের স্বায়ত্তশাসন বাড়াবে। বাজার উন্মুক্ত হলে এবং রাষ্ট্র যখন কর্মসংস্থান ও ঋণের নিয়ন্ত্রণ হারাবে, তখন মানুষ শাসকের ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবি করার সাহস পাবে। কিন্তু গত কয়েক দশকের বাস্তবতায় এই তত্ত্বের করুণ ব্যর্থতা ফুটে উঠেছে।
জোসে কাইরে দেখিয়েছেন যে, মেক্সিকো, মালয়েশিয়া এবং সেনেগালের মতো দেশগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে অর্থনৈতিক উদারীকরণের পর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্টো বেড়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক স্বৈরতান্ত্রিক দেশে বাজার উন্মুক্ত করার পর শাসকরা আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠেছেন। এই বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, মুক্ত বাজারের অদৃশ্য হাত সবসময় গণতন্ত্রের পথ প্রশস্ত করে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা দমনের পথকে আরও প্রশস্ত করে।
টেকঅ্যাওয়ে ২: এলিট বা সুবিধাভোগী শ্রেণির ভয় এবং শাসকের কৌশল
কেন অর্থনৈতিক সংস্কারের সাথে দমনপীড়ন বাড়ে? কাইরের মতে, এর মূল কারণ হলো 'এলিট' বা সুবিধাভোগী শ্রেণির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসককে টিকে থাকতে হলে সামরিক কর্মকর্তা বা দলীয় উচ্চপদস্থ নেতাদের (এলিট) সমর্থন প্রয়োজন হয়। যখন কোনো দেশে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু হয়, তখন এই এলিটরা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব হারানোর ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়ে। নতুন উদীয়মান ব্যবসায়ী শ্রেণি যাতে তাদের স্থান দখল করতে না পারে, সেজন্য তারা শাসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। শাসক তখন তার জোটের এই প্রভাবশালী অংশকে শান্ত রাখতে দমনপীড়নকে একটি 'সংকেত' হিসেবে ব্যবহার করেন। কাইরের ভাষায়:
"বিপক্ষ গোষ্ঠীকে দমন করার মাধ্যমে শাসকরা আসলে এই সংকেত দেন যে, তারা এখনও এলিটদের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দমনপীড়ন এখানে কেবল ভিন্নমত দমানোর অস্ত্র নয়, বরং এটি এলিটদের রাজনীতি পরিচালনার একটি কৌশল।"
মেক্সিকোর উদাহরণে দেখা যায়, শাসকরা এককালে সহ্য করা বিরোধীদের ওপরও চড়াও হয়েছিলেন শুধুমাত্র দলীয় এলিটদের আশ্বস্ত করতে যে, সংস্কার সত্ত্বেও তাদের রাজনৈতিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ থাকবে।
টেকঅ্যাওয়ে ৩: আন্তর্জাতিক চাপ এবং দ্বিমুখী নীতি
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন 'ওয়াশিংটন কনসেনসাস'-এর আওতায় অর্থনৈতিক উদারীকরণের চাপ দেয়, তখন স্বৈরশাসকরা এক জটিল দ্বিমুখী নীতি গ্রহণ করেন। একদিকে তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে চান, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা ধরে রাখতে চান। এই পরিস্থিতিতে তাদের কৌশলী অবস্থানগুলো হলো:
অর্থনীতি উন্মুক্তকরণ: বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর শর্ত মেনে বাজার উন্মুক্ত রাখা যাতে বৈদেশিক সাহায্য ও বাণিজ্য অব্যাহত থাকে।
আন্তর্জাতিক বিচারের ভয়: আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC)-এর মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ভয় স্বৈরশাসকদের আরও বেপরোয়া করে তোলে। ক্ষমতা হারানোর অর্থই যদি হয় কারাবরণ, তবে তারা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়।
এলিটদের সন্তুষ্টি: আন্তর্জাতিক চাপের মুখে অর্থনীতি উন্মুক্ত করলেও, শাসকরা অভ্যন্তরীণ দমনপীড়ন বাড়িয়ে দিয়ে এলিটদের আশ্বস্ত করেন যে তাদের ক্ষমতা নিরাপদ। অর্থাৎ, একদিকে বৈশ্বিক চাহিদা মেটানো হয়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ লোহ-কপাট আরও শক্ত করা হয়।
টেকঅ্যাওয়ে ৪: বর্তমান প্রেক্ষাপট—কিউবা, ভেনেজুয়েলা এবং ভবিষ্যতের শঙ্কা
কিউবা এবং ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি এই তত্ত্বের উপযুক্ত উদাহরণ। কিউবাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পার্টি এবং সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা বেড়েছে। রাউল কাস্ত্রোর শাসনামল থেকে সামরিক বাহিনী এমন অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করছে যা শাসকের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এই শক্তিশালী এলিটদের উপস্থিতিতে কিউবায় যদি আরও অর্থনৈতিক সংস্কার হয়, তবে তা দমনপীড়ন আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক অভিযানের (U.S. raid) মাধ্যমে যদি নিকোলাস মাদুরো অপসারিত হন, তবে পরবর্তী শাসনামলে এলিটরা আরও স্বাধীন ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। কাইরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে বাজার উন্মুক্তকরণ মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটাবে না, বরং এলিটদের ক্ষমতা রক্ষায় নতুন করে নির্যাতনের ঢেউ আসতে পারে।
টেকঅ্যাওয়ে ৫: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং একনায়কতন্ত্রের নতুন অস্ত্র
ভবিষ্যতের স্বৈরতন্ত্র কীভাবে প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে পুনর্গঠন করছে, তার একটি আলোচিত উদাহরণ হলো চীন। শি জিনপিংয়ের শাসনামলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও উন্নত প্রযুক্তি খাতের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর একটি উদ্দেশ্য হলো প্রযুক্তি খাতে রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে শি জিনপিংয়ের ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের অধীনে সেন্ট্রাল সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতিতে কেন্দ্রীয় পার্টির ভূমিকা আরও শক্তিশালী করে এবং প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ক্ষমতাকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে, প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী উদ্যোক্তা ও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা, তদন্ত এবং শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে চেয়েছে যে কৌশলগত প্রযুক্তির ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতেই থাকবে। সমালোচক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রযুক্তিগত কেন্দ্রীকরণ শাসকদের ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক এলিটদের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারে এবং উন্নত নজরদারি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার মাধ্যমে ক্ষমতার স্থায়িত্ব বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই বিষয়ে বিভিন্ন গবেষক ও পর্যবেক্ষকের মধ্যে মতভেদ রয়েছে; কেউ এটিকে রাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে দেখেন, আবার অন্যরা একে কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করার একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
একটি চিন্তাশীল সমাপ্তি
জোসে কাইরের বিশ্লেষণ আমাদের এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বাস করে এসেছি যে, মুক্ত বাজার মানেই মুক্তি। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে শাসকরা বাজারকে ব্যবহার করছেন তাদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে। অর্থনৈতিক সংস্কার যদি কেবল এলিটদের স্বার্থ রক্ষা এবং বিরোধীদের দমনের অজুহাত হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না।
আলোচনার শেষে একটি গভীর প্রশ্ন থেকে যায়: যদি মুক্ত বাজার গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে না পারে এবং প্রযুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত শাসকের হাতকেই আরও শক্তিশালী করে, তবে একনায়কতন্ত্রের এই শেকল ভাঙার আসল পথটি কী? আমরা কি তবে এমন এক যুগে প্রবেশ করছি যেখানে প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসলে নাগরিকের পরাধীনতাকেই আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে?





