সমুদ্র যখন বিষাক্ত নীল: ২০০ মিলিয়ন বছর আগের মহাপ্রলয় কি আবার ফিরে আসছে?

কল্পনা করুন আজ থেকে ঠিক ২০০ মিলিয়ন বছর আগের এক পৃথিবী। আমাদের পরিচিত ডাইনোসররা তখনো ধরিত্রীর একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেনি। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই ঘটেছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক বিপর্যয়—এন্ড-ট্রায়াসিক (End-Triassic) মহাবিলুপ্তি। প্রলয়ঙ্করী এই সময়ে পৃথিবীর প্রায় অর্ধেকেরও বেশি প্রজাতি চিরতরে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। একজন প্যালিওক্লাইমাটোলজিস্ট হিসেবে আমি যখন সেই প্রাচীন পাথরের স্তরে এই ধ্বংসলীলার চিহ্ন খুঁজি, তখন বর্তমান জলবায়ু সংকটের এক আতঙ্কিত প্রতিফলন দেখতে পাই। কেন সেই প্রাচীন ইতিহাস আজকের আধুনিক মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা, চলুন তা বিশ্লেষণ করি।
ডাইনোসরদের উত্থানের পেছনের রহস্য
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, একটি মহাবিলুপ্তি কীভাবে ডাইনোসরদের জন্য আশীর্বাদ হতে পারে? আসলে, ট্রায়াসিক যুগের শেষে যখন অধিকাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেল, তখন প্রকৃতিতে বিশাল এক শূন্যস্থান বা 'ইকোলজিক্যাল নিশ' তৈরি হয়। এই প্রতিযোগিতামুক্ত পরিবেশে (competition-free environment) 'ডিপ্লোডোকাস' (Diplodocus)-এর মতো বিশালকার তৃণভোজী ডাইনোসররা নিজেদের বিস্তার ঘটানোর সুবর্ণ সুযোগ পায়। অন্য সব শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হারিয়ে যাওয়ায় তারা নির্বিঘ্নে ডালপালা মেলেছিল, যা পরবর্তী ৫৫ মিলিয়ন বছর স্থায়ী জুরাসিক যুগের ভিত্তি গড়ে দেয়।
স্থবির ও দমবন্ধ এক বিষাক্ত সমুদ্র (The "Toxic Ocean" Phenomenon)
এই মহাবিলুপ্তির মূল কারণ ছিল ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, যা বায়ুমণ্ডলে প্রচুর গ্রিনহাউস গ্যাস ছড়িয়ে দিয়ে চরম বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটিয়েছিল। এই তাপের প্রভাবে প্রাচীন প্যানথালাসিক মহাসাগর (Panthalassic Ocean) হয়ে উঠেছিল এক স্থবির ও দমবন্ধ (stagnant and suffocating) ভাগাড়।
গবেষকরা ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার কানাডীয় উপকূলের 'হাইডা গুয়াই' (Haida Gwaii/Queen Charlotte Islands) অঞ্চলের প্রাচীন শিলা বিশ্লেষণ করে এর প্রমাণ পেয়েছেন। এই পাথরগুলো একসময় প্যানথালাসিক মহাসাগরের তলদেশের পলি ছিল, যা আজ ভূপৃষ্ঠে উন্মুক্ত। সেই শিলা থেকে প্রাপ্ত 'বায়োমার্কার' বা প্রাচীন জৈব অণু বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সমুদ্রের উপরিভাগের পানি প্রায় ৬ লক্ষ বছর ধরে সম্পূর্ণ অক্সিজেনশূন্য ছিল।
"মহাসাগরের এই অক্সিজেনহীন পরিবেশে 'অ্যানারোবিক ব্যাকটেরিয়া' চরমভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। এই ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবে পানিতে হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপন্ন হয়, যা নীল সমুদ্রকে অধিকাংশ প্রাণের জন্য একটি বিষাক্ত নরকে পরিণত করেছিল।"
গভীর সমুদ্র কেন তথ্যের প্রধান উৎস?
কেন বিজ্ঞানীরা অগভীর উপকূলের চেয়ে গভীর সমুদ্র বা 'পেলাজিক জোন' (Pelagic zone)-এর পলি নিয়ে কাজ করতে বেশি আগ্রহী? এর কারণ হলো উপকূলীয় অঞ্চলগুলো স্থানীয় জলবায়ুর নানা 'গোলমাল' বা ছোটখাটো পরিবর্তনের (local noise) দ্বারা প্রভাবিত হয়। কিন্তু উন্মুক্ত বা গভীর সমুদ্রের পরিবেশ অনেক বেশি স্থিতিশীল এবং তা বৈশ্বিক পরিস্থিতির একটি নির্ভুল ও সামগ্রিক চিত্র প্রদান করে। প্যানথালাসিক মহাসাগরের গভীর থেকে উঠে আসা তথ্যই আমাদের নিশ্চিত করেছে যে, সেই সময়ের জলবায়ু পরিবর্তন কেবল স্থানীয় কোনো ঘটনা ছিল না, বরং তা ছিল একটি বৈশ্বিক বিপর্যয়।
বর্তমানের জন্য একটি সতর্কবার্তা (The Modern Mirror)
ট্রায়াসিক যুগের সেই মহাপ্রলয় বর্তমান জলবায়ু সংকটের সামনে এক আয়না ধরেছে। যদিও তৎকালীন পৃথিবীতে মেরু অঞ্চলে বরফ ছিল না, কিন্তু সেই সময় আগ্নেয়গিরি থেকে যে গতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO2) নিঃসৃত হয়েছিল, তার সাথে বর্তমান জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর গতির এক ভয়ংকর সাদৃশ্য রয়েছে। এই ঘটনাটি আমাদের পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় মহাবিলুপ্তি—'এন্ড-পার্মিয়ান' (End-Permian)-এর ভয়াবহ স্মৃতিকেও মনে করিয়ে দেয়।
বর্তমান কার্বন নিঃসরণের ধারা অব্যাহত থাকলে আমরা একই ধরনের পরিণতির দিকে ধাবিত হচ্ছি:
মহাসাগরীয় অম্লকরণ (Ocean Acidification): যা সামুদ্রিক প্রাণীদের কঙ্কাল ও খোলস গঠন অসম্ভব করে তুলবে।
অক্সিজেনশূন্যতা: উষ্ণ পানিতে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেবে, যা সামুদ্রিক প্রাণীদের শ্বাসরোধ করবে।
হাইড্রোজেন সালফাইড বিষক্রিয়া: অক্সিজেনহীন সাগরে বিষাক্ত গ্যাসের আধিপত্য বাড়বে।
খাদ্যশৃঙ্খল ধ্বংস: সমুদ্রের সালোকসংশ্লেষণকারী জীবরা মারা গেলে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
এন্ড-ট্রায়াসিক মহাবিলুপ্তির ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য একবার নষ্ট হলে তা পুনরুদ্ধার হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগে। আমরা আজ যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছি, তা প্রকৃতিকে সেই প্রাচীন বিষাক্ত সমুদ্রের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। ডাইনোসরদের উত্থান হয়তো একটি মহাবিলুপ্তির ফল ছিল, কিন্তু মানুষের টিকে থাকা নির্ভর করছে এই বিলুপ্তি ঠেকানোর ওপর।
প্রাচীন এই জীবাশ্ম আর পাথরগুলো আমাদের আর্তনাদ করে সতর্ক করছে।
প্রশ্ন একটাই: আমরা কি ইতিহাসের এই ভয়াবহ পুনরাবৃত্তির দিকেই স্বেচ্ছায় এগিয়ে যাচ্ছি?





